করোনাভাইরাস -২০১৯ (কোভিড-১৯) মহামারী সরকার, অর্থনীতি ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। আজ পর্যন্ত, এই ভাইরাস মোকাবেলায় কোন কার্যকর টীকা বা চিকিৎসা আবিস্কৃত হয়নি, আর নিকট ভবিষ্যতে এটি যে পাওয়া যাবে এমন সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না । তাই এই রোগ  বিস্তার রোধে সামাজিক দূরত্ব (যেমন, হোম কোয়ারেন্টাইন, লকডাউন) মেনে চলাকেই মূল কৌশল হিসাবে গ্রহন করা হচ্ছে। এর ফলশ্রুতিতে, বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি মানুষকে এখন বাড়িতে থাকতে হচ্ছে।

দেখা গেছে এই ভাইরাস বিস্তারের গতি হ্রাস করতে ’লকডাউন’ কার্যকরী একটি পন্থা। যেমন চীন, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে  লকডাউনের মাধ্যমে মহামারীর গতিকে কমিয়ে দেয়া সম্ভব হয়েছে। এর ফলে এই দেশগুলোতে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার উপর চাপ কমে এসেছে  এবং মৃত্যুর হারও কমে গেছে।

কিন্তু সমস্যা হলো লকডাউন পরিস্থিতি দীর্ঘকাল অব্যাহত থাকলে কর্মসংস্থান, অর্থনীতি, মানসিক স্বাস্থ্য এবং সামাজিক শৃঙ্খলার ওপর এর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে (বিশেষত যেখানে সামাজিক সুরক্ষা বলয় সীমিত)। তাই লকডাউনের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সঙ্কট কাটিয়ে উঠার ক্ষমতা ধনী রাষ্ট্রগুলোর থাকলেও নিম্ন ও মধ্যম আয়ের রাষ্ট্রগুলি এ বাস্তবতায় কতদূর টিকে থাকতে পারবে, সেটি একটি কঠিন প্রশ্ন।

ধনী দেশগুলোর তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম আয়ের দেশগুলোতে লকডাউন বজায় রাখাও কঠিন। উদাহরণ হিসাবে বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে দেখা যায় প্রায় ৯০% মানুষ কাজ করে অনানুষ্ঠানিক খাতে এবং মোট জনসংখ্যার প্রায় পনেরো শতাংশ মানুষের মাথাপিছু দৈনিক গড় আয় ৫০০ টাকার কম । তাই জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ তাদের পরিবার চালাতে দৈনিক মজুরির উপর নির্ভরশীল হওয়ায় লকডাউনের মতো কঠোর পদক্ষেপ ব্যক্তি ও পারিবারিক পর্যায়ে আরও বিপর্যয় বয়ে নিয়ে আসতে পারে ।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে  দীর্ঘমেয়াদী  লকডাউন বজায় থাকলে কর্মহীনতা ও দারিদ্রতা লাগামহীন হারে বাড়তে পারে, এর সাথে বাড়তে পারে অনাহারজনিত মৃত্যুর সংখ্যাও । এতে এমন এক পরিস্থিতি সামনে আসতে পারে যেখানে অর্থনীতিজনিত মৃত্যুর সংখ্যা করোনা মহামারীতে প্রাণ হারানো সংখ্যার সমানুপাতিক হয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশে বিআইজিডি-পিপিআরসির যৌথ উদ্যোগে গ্রামে ও শহরের বস্তিতে থাকা ৫,৪৭১টি পরিবারের উপর পরিচালিত সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় ভিত্তিতে দেখা যায়, তাদের গড় আয় কমেছে প্রায় ৭০% আর খাবারের ব্যয় কমেছে ২৬%, পাশাপাশি এও উঠে এসেছে যে, এই পরিবারগুলি বাহ্যিক কোন সহায়তা ছাড়া আর সর্বোচ্চ দুই সপ্তাহ চলতে পারবে।

সঙ্কটের আরো গভীরতর রূপ সামনে আসে যখন দেখা যায় যে, এই করোনা দুর্যোগের আগে যে পরিবারগুলোর আয় জাতীয় দারিদ্র্যসীমার বেশ উপরে ছিল, তাদের ৮০% এর বেশি বর্তমানে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে এসেছে। এই স্বল্পমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাবের পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যায় যে,পূর্বের অর্থনৈতিক সামর্থ্যে ফিরে আসা নির্ভর করছে  এই সঙ্কটে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো কতটা  দ্রুত, নির্ভরযোগ্য ও যুৎসই তার উপর।

ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাপী সামাজিক অস্থিরতা ও দুর্ভোগের চিত্র ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যেমন ভারতে লক্ষ লক্ষ অভিবাসী দিনমজুর তাদের গ্রামে ফিরে যাওয়ার জন্য লকডাউন উপেক্ষা করেছে, কেনিয়ায় দোকানীরা পুলিশের সাথে দাঙ্গা বাধিয়েছে, খাদ্য সংকটের প্রভাবে দক্ষিণ আফ্রিকা ও নাইজেরিয়ার রাস্তায় মারামারি শুরু হয়েছে, এমনকি বাংলাদেশেও জরুরি ত্রাণ বহনকারী গাড়ির উপর আক্রমনের খবর সামনে এসেছে।

এটা পরিষ্কার যে স্বল্প আয়ের দেশগুলোর জন্য অর্থনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া কোনো দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হতে পারেনা। তাই বাংলাদেশসহ অনেক দেশ বর্তমানে এই লকডাউন শিথিল করার কথা বিবেচনা করছে। তবে এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, সঙ্কট থেকে বের হয়ে আসার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া দেশগুলিতে যদি লকডাউন তুলে দেয়া হয় তবে এ মহামারী প্রকট রূপ ধারণ করতে পারে। এর প্রভাব প্রথম আঘাতের চেয়ে আরও ভয়াবহ হতে পারে। এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যায়, বিশ শতকের গোড়ার দিকে স্প্যানিশ ফ্ল’র কথা যেটির দ্বিতীয় আঘাত প্রথমটির তুলনায় অধিক বিভিষীকাময় ছিল।

সুতরাং অত্যন্ত জরুরী বিষয় হলো – মহামারীকালীন মৃত্যু এবং অর্থনৈতিক পতন – এ দুইয়ের মধ্যে কিভাবে ভারসাম্য তৈরি করা যায়? আরও সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, মহামারীকালে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে দেশগুলি কিভাবে অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে পারে? এসময়ে সামাজিক পর্যায়ে করনীয়গুলি কী? করোনা মোকাবিলা ও একইসাথে অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলিতে কি ধরণের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাই বা গ্রহণ করা উচিত?

এই প্রশ্নগুলোর সহজ কোন উত্তর নেই,  তবে এমন পরিস্থিতিতে সকলের সুসমন্বিত উদ্যোগ ও একত্রে তাল মিলিয়ে কাজ করা জরুরি। আর এ বিষয়ে সমন্বয় ও কর্মপন্থা কেমন হবে তা নিয়ে আলোচনা হওয়া এখন খুব প্রয়োজন।

এই আলোচনাকে সাহায্য করার জন্য, বর্তমান বাস্তবতার প্রেক্ষিতে, আমরা ২০ দফা উত্তরণ কৌশল প্রস্তাব করছি। এই প্রস্তাবনা আমরা তিনটি মূল বিষয়কে মাথায় রেখে সাজিয়েছি: কর্মক্ষেত্র, সমাজ এবং স্বাস্থ্যখাত।

কর্মক্ষেত্রঃ

১) শারীরিক দূরত্ব এবং স্বাস্থ্যসুরক্ষা বিষয়ক প্রশিক্ষণের ভিত্তিতে সব কর্মীদের আরো সচেতন করে তোলা ।  কাজের সময়ে যে সকল স্বাস্থ্যবিধি এবং শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা জরুরী, সকল কর্মীর জন্য সে বিষয়ক প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ  নিশ্চিত করা নিয়োগকর্তার একটি প্রধান দায়িত্ব।

২) মাস্ক ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তোলা

সর্বক্ষেত্রে সকল শ্রমিকদের জন্য যথাসম্ভব মাস্ক ও হ্যান্ডগ্লাভস সহজলভ্য করতে হবে। এই জিনিসগুলো একটি স্বল্প আয়ের দেশের জন্য খুব একটা ব্যয়সাপেক্ষ হওয়ার কথা না তাই সহজেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব। তবে এর জন্য সঠিক পরিকল্পনা, প্রস্তুতি এবং একই সঙ্গে এগুলোর সঠিক ব্যবহারের যথাযথ প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

৩) কর্ম পরিবেশ পরিবর্তন

-যেখানে যেখানে প্রয়োজন, সুস্পষ্ট এবং সহজবোধ্য নির্দেশিকা দিতে হবে, যেমনঃ দেয়াল ও মেঝেতে ছবি এঁকে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার কথা মনে করিয়ে দেওয়া যেতে পারে।

– শিফটের শুরুতে বা শেষে কর্মীদের চলাচল এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে যাতে কর্মীরা নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে পারে।

-কর্মীদের সীমানা নির্ধারণ করে দেওয়া যেতে পারে, যাতে তাদের চলাফেরা শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে

– সম্ভব হলে ব্যারিকেড ব্যবহার করে কর্মক্ষেত্রে কর্মীদের আলাদা রাখার চেষ্টা করতে হবে।

-পর্যাপ্ত সংখ্যক প্রবেশ ও প্রস্থানের ব্যবস্থা থাকতে হবে যাতে খুব বেশি ভিড় না হয়।

– দোকানপাটে একমুখী চলাচলের নিয়ম এবং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। দোকান (যেমন সুপারশপ) এবং রেস্তোঁরাতে একসাথে নির্দিষ্টসংখ্যক গ্রাহকের বেশী প্রবেশের অনুমতি দেয়া যাবে না। কাউন্টারে কাঁচ, থাই অ্যালুমিনিয়ামের (নূন্যতম পলিথিনের) প্রতিবন্ধক স্থাপন করা যেতে পারে।

৪) শ্রমিকদের সীমিতভাবে কাজ করার সুবিধা প্রদান

বিশাল কর্মীবহর কিন্তু সীমিত জায়গা – এরকম কারখানায় এই পদ্ধতিটি সংক্রামণের ঝুঁকি হ্রাস করতে পারে। তবে এর ফলে কারখানার সামগ্রিক উৎপাদন কিছুটা কমে যাবে, শ্রমিকদের আয়ও কিছুটা হ্রাস পেতে পারে। তবে এই ব্যবস্থা অন্তত মন্দের ভালো।  দীর্ঘমেয়াদী লকডাউন যেমন খারাপ তেমনি শারীরিক দূরত্ব বজায় না রাখায় হঠাৎ প্রচুর সংখ্যক কর্মী একই সময়ে অসুস্থ হয়ে পুরো কারখানাটি বন্ধ হওয়াও কাম্য নয়। এরকম অবস্থায় এই পদ্ধতিটি ভারসাম্য নিয়ে আসতে পারে।

৫) সকল শ্রমিকের জন্য পর্যাপ্ত পানি, সাবান ও সাধারণ স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করা এবং জীবাণুনাশক সরবরাহ করা ।

কর্মক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা সব সময় মেনে চলতে হবে।

৬)  “স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা” বিষয়গুলো নিশ্চিতকরণে কর্মকর্তা নিয়োগ ।

উপরের সমস্ত পদক্ষেপগুলি যথাযথভাবে প্রয়োগ করা ও নিয়মিতভাবে তা মানা হচ্ছে কি না, তা দেখার জন্য একটি পদ তৈরি করা যেতে পারে।

৭) একটি সুস্পষ্ট জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, এবং লকডাউন তুলে নেওয়ার আগে এই নীতিমালা কঠোরভাবে মানার ব্যাপারে সব ব্যবসায়ীকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

ওপরের কৌশলগুলোসহ অন্যান্য উপযুক্ত কৌশল বিবেচনা করে একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে পরিষ্কারভাবে বলা থাকবে যে কি কি করতে হবে। খাতভেদে এই নীতিমালা ভিন্ন হতে পারে।

সমাজ পর্যায়ে:

৮) প্রবীণ এবং শারীরিক ভাবে দুর্বলদের রক্ষা করা।

প্রবীণ (৬০ ঊর্ধ্ব) এবং স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকা মানুষ, যেমন – যাদের হৃদরোগ, শ্বাসকষ্ট, উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিস আছে তাদের কোভিড-১৯ এর ঝুঁকি সবচেয়ে বেশী। তাই এই শ্রেণীর মানুষদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। তবে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে প্রায়ই তিন প্রজন্ম একই ছাদের নিচে বাস করে। তাই সেখানে বয়স্কদের এবং ঝুঁকিতে থাকা সদস্যদের আলাদা করা কঠিন। বিশেষত প্রবীণ সদস্যদের অন্যের সাহায্য প্রয়োজন হতে পারে। সুতরাং, তাঁদের সাথে বাড়ির নির্দিষ্ট একজন সদস্যকেও আলাদা করে দেওয়া যেতে পারে। যারা বাইরে কাজ করেন বা পড়াশোনা করেন, তাদের অবশ্যই বাড়ির বেশী  ঝুঁকিতে থাকা সদস্যদের কাছ থেকে সবসময় শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে।

৯) মাস্ক ব্যবহার  করা ।

বাইরে থাকা অবস্থায় মাস্ক ব্যবহার করা উচিত, বিশেষত গণপরিবহণ, সুপারশপ / বাজার, হাসপাতাল / ক্লিনিক এবং জনাকীর্ণ অফিস (যেমন ব্যাংক বা ডাকঘর) এর মতো সম্ভাব্য “উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ” পরিবেশে মাস্ক পরতেই হবে। পরিবারের সদস্যদের কারো যদি কোভিডের লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে পারিবারিক পরিসরেও অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করা জরুরী।

১০) গণজমায়েত সীমিত রাখা

মহামারীর পরবর্তী সময়ের ঝুঁকি মোকাবিলায় অপ্রয়োজনীয় জমায়েত অবশ্যই সীমিত রাখতে হবে, যেমন, ধর্মীয় (মসজিদ / মন্দিরভিত্তিক বা সম্প্রদায়ভিত্তিক), সামাজিক (যেমন, বিবাহ, খেলাধুলা, সিনেমা-থিয়েটার) এবং রাজনৈতিক সমাবেশ। যেখানেই  ৫০ এর বেশি লোক উপস্থিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে, সেখানেই এই নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য। গণপরিবহনের জন্যও উপযুক্ত সামাজিক দূরত্বের নির্দেশনা রাখা উচিত (যেমন মাঝখানে আসন ফাঁকা ছেড়ে দেওয়া)।

১১)  সম্ভব হলে ঘরে বসে কাজ করাকে উৎসাহিত করা।

যেসব ক্ষেত্রে অফিসের কাজ ঘরে বসেই করা সম্ভব এবং কর্মীদের বাড়িতে কাজ করার যথোপযুক্ত ব্যবস্থা আছে, সেসব ক্ষেত্রে ঘরে বসে কাজ করাকে উৎসাহিত করতে হবে।

১২)  সামাজিক পর্যায়ে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করা ।

জাতীয় এবং স্থানীয় উভয়স্তরে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়ে

– মৌলিক স্বাস্থ্যবিধি এবং স্যানিটেশন সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে হবে,

– করোনা নিয়ে বিদ্যমান সামাজিক কুসংস্কার ও ভুল ধারণাসমূহ দূর করতে হবে, এবং

– করোনার ঝুঁকিগুলো সম্বন্ধে মানুষকে শেখাতে হবে

১৩)  স্বাস্থ্য এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা উন্নয়ন ।

সংক্রমণের সাথে লড়াই করতে সুস্থ থাকা খুব জরুরী। স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা সুস্থতার প্রতীক। একটি সবল ফুসফুস এবং উচ্চমাত্রার রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা থাকলে ভাইরাস সহজে কাবু করতে পারবে না। যেমন ধূমপান বন্ধ রাখা, নিয়মিত উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসের ঔষধ খাওয়া, ব্যায়াম করা এবং পর্যাপ্ত ঘুমানো – এগুলো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখতে সাহায্য করবে।

স্বাস্থ্যসেবা খাত:

১৪)  প্রচুর পরিমাণে কোভিড-১৯ পরীক্ষার পাশাপাশি শনাক্ত ও বিচ্ছিন্নকরণ (test-trace-isolate) ।

এটি নিশ্চিত করতে গেলে সাশ্রয়ী এবং সহজলভ্য ডায়গনস্টিক টেষ্ট বাড়াতে হবে এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের শনাক্তকরণে সংযুক্ত করতে হবে নিয়োগ করতে হবে । এছাড়া বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, যেমন Apps অথবা ক্ষুদেবার্তার ব্যবহার শনাক্তকরণে কাজে লাগানো যেতে পারে।

১৫)  এলাকাভিত্তিক লক-ডাউন (যা “Cordon Sanitaire”  নামেও পরিচিত) প্রয়োগ করা।

হঠাৎ একটি অঞ্চলে ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বা পুনসংক্রমন হলে, সেই নির্দিষ্ট ”হটস্পটে” লকডাউন প্রয়োগ করতে হবে।

১৬) একটি বড় জনসংখ্যা নিয়ে ”এমিডেমিওলজিক্যাল স্যারো-সার্ভিলেন্স” (Sero-surveillance) প্রতিষ্ঠিত করা।

এটি নিচের জনস্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিষয়গুলো জানতে সাহায্য করবে-

ক) ভাইরাসটির গতি নতুন কোন দিকে মোড় নিচ্ছে কি না ।

খ) কতজন মানুষের ভেতরে কোভিড-১৯ এর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে

এছাড়া কত শতাংশ মানুষে টীকার প্রয়োজন হবে তাও জানা যাবে।

১৭) ”রোলিং” লকডাউন পদ্ধতি ।

এটি একটি আকর্ষণীয় মিশ্র পদ্ধতি, যেখানে কিছুদিন সারা দেশে লকডাইন করা হয় আবার কিছু দিনের জন্য খুলে দেওয়া হয়। এটি চক্রাকারে চলতে থাকে যতদিন টীকা আমাদের হাতে না পৌছাচ্ছে। এই “স্যুইচ-অন, স্যুইচ-অফ” লকডাউন পদ্ধতিটি রোগের হার যেমন কমাতে সহায়তা করে তেমনি মানুষের অর্থনৈতিক অসুবিধা কমিয়ে একটি সঠিক ভারসাম্য দিতে পারে। আমরা বর্তমানে এমনই একটি আন্তর্জাতিক মডেল নিয়ে কাজ করছি যেটি নিম্ন আয়ের দেশে কতদিন এধরণের “রোলিং লকডাউন” করতে হবে তা  নির্ধারণ করবে।

১৮) অতিজরুরী স্বাস্থ্যসেবাকাঠামো উন্নতকরন।

অর্থনৈতিক কার্যক্রম শুরু হওয়ার সাথে সাথে আইসিইউ, ভেন্টিলেটর, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামের পাশাপাশি মানুষের দক্ষতা ও সক্ষমতা (যেমন, ডাক্তার / নার্সদের পুনঃপ্রশিক্ষণ দেওয়া) বৃদ্ধির প্রচেষ্টা চালু রাখতে হবে।

১৯) করোনাভাইরাসের জন্য প্রাথমিক (অন্তঃবর্তীকালীন) হাসপাতাল এবং ডায়াগনস্টিক সুবিধা তৈরী।

এগুলো উপজেলা থেকে জেলা পর্যায়ে প্রতিষ্ঠা করা দরকার। এটি করার জন্য বর্তমানে যেসব স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো আছে সেগুলোকে বিশেষায়িত করা যেতে পারে এবং সরকারী বেসরকারী অংশীদারিত্বে নতুন কেন্দ্রও স্থাপন করা যেতে পারে।

২০) উপরোক্ত পন্থাগুলো বাস্তবায়নের  জন্য সরকারী-বেসরকারী-ব্যক্তিগত অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা।

সরকারী, বেসরকারী ও জনগনের সমন্বিত উদ্ভাবনী প্রচেষ্টায় নানান জনস্বাস্থ্য সমস্যা (যেমন ডায়রিয়ার ঘরোয়া চিকিৎসা, মাতৃ এবং শিশু স্বাস্থ্যের সংক্রমণ হ্রাস এবং সামগ্রিক পুষ্টি উন্নতকরণ) সমাধানের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বাংলাদেশ সৃষ্টি করেছে,যা কিনা আমাদেরকে অনেকগুলো মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল (এমডিজি) অর্জন করতে সাহায্য করেছে। জনস্বাস্থ্য সমস্যা মোকাবেলায় এই ঐতিহাসিক সাফল্যগুলো সম্ভব হয়েছে শুধুমাত্র সরকারী বেসরকারী অংশীদারিত্বের মাধ্যমে- যা আমাদের বর্তমান করোনা সংকটেও কাজে লাগাতে হবে।

বর্তমানে আমরা অজানা হুমকির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি, যেখান থেকে উত্তরণের সুনির্দিষ্ট কোন পরিকল্পনা ও  দিকনির্দেশিকা এই মুহুর্তে আমাদের কাছে নেই । তাই বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলির পক্ষে  দেশব্যাপী সামাজিক দূরত্বের বাধ্যবাধকতা  শিথিল করার কথা চিন্তা করার আগে নিজস্ব  ”সুনির্দিষ্ট উত্তরণ কৌশল” প্রণয়ন করতে হবে।

আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের প্রস্তাবিত এই বিশটি পন্থা বাংলাদেশকে একটি উত্তরণনীতি প্রণয়ন করতে সাহায্য করবে।


ডঃ রাজীব চৌধুরী, গ্লোবাল হেলথ এপিডেমিওলজিস্ট এবং অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর, ইউনিভার্সিটি অফ কেমব্রিজ, ইউনাইটেড কিংডম 

ডঃ ইমরান মতিন, নির্বাহী পরিচালক (এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর), ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অফ গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি), ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ

ডঃ অস্কার ফ্রাংকো, গ্লোবাল পাবলিক হেলথ এক্সপার্ট, ডিরেক্টর, ইন্সটিটিউট অফ সোশ্যাল অ্যান্ড প্রিভেনটিভ মেডিসিন, ইউনিভার্সিটি অফ বার্ন, সুইজারল্যান্ড

ভাষান্তরে: তানভীর শাতিল, ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অফ গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি)